কলকাতা, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬: একসময় বাংলার নবাবী রাজধানী এবং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি—মুর্শিদাবাদ কেবল মানচিত্রের একটি স্থান নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। তার প্রাসাদ, নদীর ঘাট, রেশম তাঁত ও শতাব্দী প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান আজও গঙ্গার স্রোতের সাথে ইতিহাসের গল্প বলে চলে। এই ঐতিহাসিক শহরটি ২০২৬ সালের ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভেলপমেন্টস সোসাইটি (এমএইচডিএস)-এর উদ্যোগে আয়োজিত মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর মাধ্যমে তার রাজকীয় গৌরব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চলেছে।
কাঠগোলা বাগান ও প্রাসাদ, অভিজাত কোঠি, প্রাচীন মসজিদ ও মন্দির এবং গঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা মনোরম পরিবেশে আয়োজিত এই তিন দিনের উৎসবটি একসময়ের নবাবী মুর্শিদাবাদের শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, সংগীত ও খাদ্য ঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত উদযাপন।
উৎসবের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা নবাবী ও বণিক যুগের মার্জিত জীবনধারায় এক নিমগ্ন যাত্রার অভিজ্ঞতা পাবেন—যেখানে সংস্কৃতি ছিল পরিশীলিত, খাদ্য ছিল শিল্প এবং স্থাপত্য প্রতিফলিত হতো ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের অনন্য মেলবন্ধন।
উৎসবের অংশ হিসেবে থাকবে ঐতিহ্যবাহী পদযাত্রা, প্রাসাদ পরিদর্শন, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নৌকা ভ্রমণ ও সঙ্গীত সন্ধ্যা। অংশগ্রহণকারীরা ঘুরে দেখবেন হাজারদুয়ারি প্যালেস, কাটরা মসজিদ, নশিপুর রাজবাড়ি, কাঠগোলা প্রাসাদ, বড়ি কোঠি, জৈন কোঠি, জগৎ শেঠ মিউজিয়াম এবং তাঁতিপাড়ার ঐতিহাসিক অলিগলি—যার পাশ দিয়ে চিরন্তন সাক্ষীর মতো বয়ে চলবে গঙ্গা।

রানী ভবানীর মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের ওপর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আজিমগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী নৌকা দৌড়, নদীতে চা চক্র, গঙ্গা আরতি, আতশবাজি ও সঙ্গীত সন্ধ্যা উৎসবকে করে তুলবে আবেগময় ও স্মরণীয়।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধ রন্ধন ঐতিহ্য—রাজকীয় হেঁশেলের শেহেরওয়ালি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী রেসিপি থেকে শুরু করে ঘাটের ধারের জনপ্রিয় স্থানীয় খাবার পর্যন্ত। অতিথিরা হাউস অফ শেহেরওয়ালি, বাড়ি কোঠি ও কাঠগোলার মতো ঐতিহ্যবাহী হোটেলগুলিতে ঐতিহাসিক স্বাদের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
পাশাপাশি, মুর্শিদাবাদের কিংবদন্তিতুল্য রেশম শিল্পের কেন্দ্র তাঁতিপাড়া-কে ও বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হবে। মুর্শিদাবাদ সিল্ক শাড়ি, জটিল বুনন কৌশল ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কারিগরদের দক্ষতা বাংলার বস্ত্রশিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের এক জীবন্ত নিদর্শন।
এমএইচডিএস-এর প্রেসিডেন্ট প্রদীপ চোপড়া বলেন, “মুর্শিদাবাদ তার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য উৎসবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই উৎসব শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কালজয়ী ঐতিহ্যকে উদযাপন করবে।”
এমএইচডিএস-এর ফাউন্ডিং মেম্বার সন্দীপ নওলখা বলেন, “মুর্শিদাবাদ শুধু একটি গন্তব্য নয়—এটি ভারতীয় ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা চাই মানুষ এর আত্মাকে অনুভব করুক, এর পথে হাঁটুক, এর খাবারের স্বাদ নিক এবং একটি অর্থপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে এই ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হোক।”
মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়—এটি ইতিহাস, শিল্প ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত জগতে প্রবেশের বিরল সুযোগ।
