কলকাতা, ১৪ মার্চ ২০২৬: ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দ্রুত ডিজিটালাইজেশন, সাইবার হুমকি, পরিবর্তিত নিয়ন্ত্রক প্রত্যাশা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তি—এসবই বিশ্বজুড়ে সংস্থাগুলোর ঝুঁকির পরিবেশকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে, যা ঐতিহ্যগত শাসনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে, সংস্থাগুলিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি পূর্বাভাস দিতে এবং শাসন কাঠামোকে শক্তিশালী করতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকদের ভূমিকা ক্রমশ আরও কৌশলগত হয়ে উঠছে—এই বিষয়টি ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারনাল অডিটরস (IIA) ইন্ডিয়া – কলকাতা চ্যাপ্টার-এর বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ তুলে ধরা হয়। এই অনুষ্ঠানে কর্পোরেট গভর্নেন্সকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে আলোচনার জন্য অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পেশাজীবী, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পক্ষেত্রের নেতৃবৃন্দ একত্রিত হন।
সম্মেলনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মি. কৃষ্ণন ভেনুগোপাল, প্রেসিডেন্ট, IIA ইন্ডিয়া। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মি. নীরজ বানসাল, হেড – ইন্ডিয়া গ্লোবাল, KPMG। তিনি বৈশ্বিক ঝুঁকির পরিবর্তনশীল ধারা, বোর্ডের প্রত্যাশা এবং শক্তিশালী ও স্থিতিশীল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত তুলে ধরেন।
“ভারত আর বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি নয়। আজকের দিনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক ভৌগোলিক অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাইবার ঝুঁকি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকদের এই ঝুঁকিগুলোকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং সংস্থাগুলিকে তাদের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করা প্রত্যাশিত,” বলেন অবিন মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্ট, IIA ইন্ডিয়া – কলকাতা চ্যাপ্টার।
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “ইন্টারনাল অডিট: কন্ট্রোল – রিস্ক – গভর্নেন্স অ্যান্ড বিয়ন্ড”, যা বর্তমানের জটিল ও পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত বৈশ্বিক পরিবেশে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দ্রুত বিস্তৃত পরিসর এবং এর ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে যেখানে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকদের মূল দায়িত্ব ছিল লেনদেন যাচাই করা এবং নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা, সেখানে এখন তাদের কাছ থেকে উদীয়মান ঝুঁকি মূল্যায়ন করা, শাসন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে একটি সংস্থার সামগ্রিক বিকাশে আরও বিস্তৃত ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
“একই সঙ্গে প্রযুক্তি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্র হিসেবে উঠে আসছে। প্রতারকরা ক্রমশ উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভুয়া নথি তৈরি করা বা ফিশিং আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করছে। তাই সংস্থাগুলিকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে,” বলেন মুখোপাধ্যায়।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ঝুঁকির পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষায়িত পেশাদারদের প্রয়োজনীয়তা এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন দক্ষতা অর্জন (রিস্কিলিং) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“পরিবর্তনের গতি এখন অত্যন্ত দ্রুত হয়ে উঠেছে। আগে প্রযুক্তির পরিবর্তনের চক্র এক দশক ধরে বিকশিত হতো, কিন্তু আজ তা কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে যেতে পারে। তাই অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকদের কার্যকর থাকতে হলে ধারাবাহিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত অপরিহার্য,” তিনি মন্তব্য করেন।
এই সম্মেলনে সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার ভূমিকা কীভাবে শুধুমাত্র অনুগত্য নিশ্চিতকরণ (কমপ্লায়েন্স অ্যাসিউরেন্স) থেকে কৌশলগত উপদেষ্টা-র ভূমিকায় রূপান্তরিত হচ্ছে, সেই পরিবর্তনশীল ধারা নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রযুক্তিগত অধিবেশনগুলোতে আলোচনা করা হয় যে, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে কেবল ঐতিহ্যগত নিশ্চয়তা প্রদানের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে আরও অগ্রদৃষ্টিসম্পন্ন ও অন্তর্দৃষ্টি-নির্ভর হয়ে ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডের কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিকশিত হতে হবে। এছাড়াও দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা শিল্পক্ষেত্র ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সঞ্চালিত হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে।
এই উপলক্ষে একটি স্মারকও প্রকাশিত হয়, যেখানে বিশিষ্ট পেশাদার বিশেষজ্ঞদের লেখা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্মারকটির সম্পাদনা করেছেন মি. সুমন চৌধুরী, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও BOG সদস্য।
