MV5BOWUwNGEwMWEtMzA1Yy00ZDRhLWIwMDctZjkwNzliY2ZlYzllXkEyXkFqcGc@._V1_
Spread the love

ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ, আপসহীন অভিনয়শৈলীর ধারক এবং অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী নানা পাটেকার (বিশ্বনাথ পাটেকার) আজ, ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রয়াত হয়েছেন। গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।


প্রারম্ভিক জীবন ও সংগ্রামের দিনগুলি
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জাঞ্জিরায় একটি মারাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বনাথ পাটেকার। জীবনের শুরুটা রূপালি পর্দার মতো মসৃণ ছিল না। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে খুব অল্প বয়সেই তাঁকে উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়। মুম্বাইয়ের রাস্তায় সিনেমা পোস্টার এঁকে এবং জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্ট থেকে পড়াশোনা করার সময় তিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই চরম দারিদ্র্য এবং সংগ্রামই পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়ে সেই তীক্ষ্ণ সত্যতা ও তীব্র আবেগ এনে দিয়েছিল।
থিয়েটার থেকে রূপালি পর্দা
মঞ্চনাটক ছিল তাঁর আসল পাঠশালা। মারাঠি থিয়েটারে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিদ্যুৎগতির মতো। ১৯৭৮ সালে মুজাফফর আলির ছবি ‘গমন’-এর মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিষেক ঘটে। তবে মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে তাঁকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
১৯৮০-র দশকের শেষভাগে এন. চন্দ্রর ‘অঙ্কুশ’ (১৯৮৬) এবং ‘প্রতিঘাত’ (১৯৮৭)-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের নজর কাড়ে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিন্দা’ ছবিতে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ‘আন্না শেঠ’-এর চরিত্রে তাঁর অভিনয় হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সাইকোপ্যাথ ডনের চরিত্রে সেই অবিস্মরণীয় অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।


মাইলফলক কাজ ও অবিস্মরণীয় চরিত্র
নানা পাটেকার ছিলেন সেই বিরল অভিনেতাদের একজন, যাঁদের জন্য আলাদাভাবে কোনো প্রচলিত নায়কোচিত চেহারার প্রয়োজন পড়েনি; তাঁর স্বরভঙ্গি, তীক্ষ্ণ চোখ এবং অদ্ভুত ডায়লগ ডেলিভারিই দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখত।
* প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক (১৯৯১): কেবল অভিনয়ই নয়, এই ছবির পরিচালনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। ছবিটির জন্য তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাশুট রেজিমেন্টে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত নিয়েছিলেন।
* ক্রান্তিবীর (১৯৯৪): এই ছবির “ইয়ে মুসলমান কা খুন, ইয়ে হিন্দু কা খুন…” সংলাপটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সমাজ সচেতনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ছবিতে প্রতাপ নারায়ণের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান।
* খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬): বোবা-বধির বাবার চরিত্রে তাঁর সংলাপহীন অথচ তীব্র অভিব্যক্তিপূর্ণ অভিনয় আজও দর্শকের চোখে জল এনে দেয়।


* আব তক ছাপ্পান (২০০৪): এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট দয়া নায়কের অনুপ্রেরণায় তৈরি চরিত্র ‘সধো আগাশে’-তে তাঁর ঠান্ডা মাথার বাস্তবসম্মত অভিনয় ক্রাইম ড্রামার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিল।
* ওয়েলকাম (২০০৭): শুধু তীব্র বা প্রতিবাদী চরিত্রেই নয়, কমেডিতেও যে তিনি সমান পারদর্শী, তা ‘উদয় শেঠ’ চরিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন।


* নটসম্রাট (২০১৬): মারাঠি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই ছবিকে এক ক্লাসিক মর্যাদা দেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত শেক্সপীয়ারিয়ান থিয়েটার অভিনেতার ট্র্যাজিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
সমাজকর্মী নানা পাটেকার: ‘নাম ফাউন্ডেশন’
পর্দার বাইরের নানা পাটেকার ছিলেন আরও বেশি মানবিক ও সমাজসচেতন। মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত অঞ্চলে যখন কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন ২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (Naam Foundation)। নিজের জমানো টাকা দান করার পাশাপাশি তিনি কৃষকদের ঋণমুক্তি, পুনর্বাসন ও নদী খনন প্রকল্পের কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সাধারণ মানুষের পাশে এভাবে দাঁড়ানো তারকা ভারতীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত বিরল।


বিতর্কের ছায়া
নানা পাটেকারের জীবন কেবল প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বিভিন্ন সময় বিতর্কও তাঁর পিছু নিয়েছে। শুটিং সেটে তাঁর স্পষ্টবাদিতা, মেজাজ এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে ওঠা অভিযোগ তাঁর জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল। যদিও পুলিশের তদন্তে প্রমাণের অভাবে তাঁকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়, তবুও তিনি বরাবর নিজের মতো করে নিভৃতে থেকে জীবন পরিচালনা করেছেন।


এক অপূরণীয় ক্ষতি
নানা পাটেকার কোনো গৎবাঁধা সেলিব্রিটি ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিল্প ও মাটির কাছাকাছি থাকা একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তাঁর সংলাপ বলার সেই বিশেষ ছন্দ, বিরতিহীন তীব্রতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শরীরী ভাষা ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক বিশেষ ধারা হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এক অদ্বিতীয় প্রতিভা, আর সাধারণ মানুষ হারাল মাটির কাছের এক নিঃস্বার্থ বন্ধুকে।