কলকাতা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা মহিলাদের কাছে চিকিৎসা শেষ হওয়া কোনও যাত্রার শেষ নয়, বরং এটি জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। সাহস, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার এই যাত্রাকে উদযাপন করতে শনিবার মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস-এর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ‘দ্য কারেজ ওয়াক – অনকো-গাইনি সারভাইভার মিট ২০২৬’। অনুষ্ঠানে ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মহিলারা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিশিষ্ট অতিথিরা একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সারভাইভাররা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ে তাঁদের সাহস, পরিবারের ও কাছের মানুষের সাহায্য এবং নিজেদের লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চৈতালি দাশগুপ্ত, দূরদর্শনের প্রাক্তন অ্যাঙ্কর ও শিল্পী, এবং তনুশ্রী শঙ্কর, বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও বিশেষ করে তোলে এবং ক্যানসারের পরেও আশা, নিজের মনের কথা প্রকাশ করা এবং নতুন করে জীবনকে উপভোগ করার গুরুত্ব তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কোমল দশোরা, ক্লাস্টার ডিরেক্টর – মুকুন্দপুর ক্লাস্টার, মণিপাল হসপিটালস; এবং উপস্থিত ছিলেন ইএম বাইপাসের গাইনি-অনকোলজি দলের সদস্যরা। দলের নেতৃত্বে ছিলেন ডা. অরুণাভ রায়, এইচওডি – গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট – গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে ও সল্টলেক। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ডা. নেহা আগরওয়াল, কনসালট্যান্ট, গাইনিকোলজিক্যাল অনকো-সার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস, এবং ডা. অরুণাশিস মল্লিক, কনসালট্যান্ট, গাইনিকোলজিক্যাল অনকো-সার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মহিলারা।

অনুষ্ঠানে ক্যানসার সারভাইভাররা তাঁদের রোগ ধরা পড়া, চিকিৎসা, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং নতুন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। সময়মতো রোগ ধরা পড়া, সঠিক চিকিৎসা, মানসিকভাবে পাশে থাকা এবং পরিবারের ও কাছের মানুষের সাহায্য ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়ে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়টিও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে আনন্দের একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল সারভাইভারদের ফ্যাশন শো। তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে র্যাম্পে হাঁটেন এবং ক্যানসারের পর নিজেদের নতুন জীবনকে উদযাপন করেন। এই ফ্যাশন শো তাঁদের আনন্দ, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন করে জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছাকে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে চৈতালি দাশগুপ্ত বলেন, “দ্য কারেজ ওয়াক-এর অংশ হতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত। এটি এমন সব মহিলার সাহসকে উদযাপন করার একটি বিশেষ মুহূর্ত, যাঁরা জীবনের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়ে অসাধারণ সাহস দেখিয়েছেন। প্রতিটি সারভাইভারের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের কঠিন সময়েও আশা খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যানসার নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা খুবই জরুরি। মহিলাদের নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে হবে এবং তাঁদের জানতে হবে যে এই লড়াইয়ে তাঁরা একা নন। আজকের দিনটি শুধু তাঁরা কী কী কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছেন, তা মনে করার দিন নয়, বরং তাঁদের আত্মবিশ্বাস, আনন্দ এবং সামনে থাকা নতুন সম্ভাবনাগুলিকে উদযাপন করার দিন। এই সাহসী মহিলাদের সঙ্গে আজকের এই বিশেষ মুহূর্তটি ভাগ করে নিতে পেরে আমি গর্বিত।”
তনুশ্রী শঙ্কর বলেন, “দ্য কারেজ ওয়াক সাহস, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং মানুষের লড়াই করার শক্তিকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরে। এই সারভাইভারদের এত আত্মবিশ্বাস এবং আনন্দের সঙ্গে হাঁটতে দেখা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। নাচ এবং শরীরের চলাফেরা আমাকে সবসময় শিখিয়েছে যে কঠিন সময়ের পরেও শরীর ও মন আবার শক্তি খুঁজে পেতে পারে। আজকের অনুষ্ঠানেও সেই কথাই খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এই ধরনের অনুষ্ঠান সারভাইভারদের মধ্যে একসঙ্গে থাকার অনুভূতি তৈরি করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে চিকিৎসা শেষ হওয়ার সঙ্গে তাঁদের যাত্রাও শেষ হয়ে যায় না। বরং এর পর শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যেখানে থাকে আশা, আত্মবিশ্বাস এবং আবার নিজের মতো করে জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ। এই বিশেষ অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।”

অনুষ্ঠানে ডা. অরুণাভ রায় বলেন, “প্রতিটি সারভাইভারের জীবনের গল্পে রয়েছে অসীম সাহস। দ্য কারেজ ওয়াক সেই সাহসী যাত্রাগুলিকেই উদযাপন করে। ভারতে গাইনিকোলজিক্যাল ক্যানসারের সমস্যা এখনও যথেষ্ট বড়। ২০২২ সালে শুধু সার্ভিক্যাল ক্যানসারেই আনুমানিক ৭৯ হাজার নতুন রোগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এর পাশাপাশি ওভারিয়ান এবং ইউটেরাইন ক্যানসারেরও যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। এই সংখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সচেতনতা বাড়ানো, সময়মতো রোগ ধরা এবং সঠিক চিকিৎসা পাওয়া কতটা জরুরি। গাইনিকোলজিক্যাল ক্যানসারের চিকিৎসা কঠিন হতে পারে। তবে সময়মতো রোগ ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা হলে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং তাঁরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। আমাদের লক্ষ্য হল রোগ ধরা পড়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং চিকিৎসার পরের সময় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মহিলাদের সঠিক চিকিৎসার পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়া। আজ আমরা যে গল্পগুলি শুনলাম, সেগুলি মনে করিয়ে দেয় যে ক্যানসার জীবনের একটি কঠিন অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু এটি কোনও মহিলার পুরো জীবনকে ঠিক করে দেয় না। আমরা আশা করি, এই গল্পগুলি আরও বেশি মহিলাকে নিজেদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হতে, কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করবে।”
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে রাধা মৈত্র, ৬৪ বছর বয়সি গড়িয়ার বাসিন্দা, বলেন, “আমার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তাই আমাকে কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক্স-রে করার পর চিকিৎসকরা জানান যে আমার ফুসফুসে জল জমেছে এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। জল বের করার জন্য একটি পদ্ধতি এবং বায়োপসি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বায়োপসি রিপোর্টে জানা যায় যে আমার ওভারিয়ান ক্যানসার হয়েছে। এরপর আমি মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাসে ডা. অরুণাভ রায়ের কাছে আসি। প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা করার পর ডা. রায় আমার ১৫ ঘণ্টার একটি অস্ত্রোপচার করেন। এরপর আমাকে ছয়টি কেমোথেরাপি নিতে হয় এবং ওষুধও চলতে থাকে। এখন আমি ভালো আছি এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। আমার চিকিৎসা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পুরো সময়ে চিকিৎসক এবং হাসপাতালের সমস্ত কর্মীরা যেভাবে পাশে থেকেছেন, তার জন্য আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।”
আর এক সারভাইভার মিঠু রায়, ৪৮ বছর বয়সি শিয়ালদহের বাসিন্দা, বলেন, “আমার জরায়ুতে একটি টিউমার ধরা পড়ে এবং তার জন্য আমার অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের সাত দিন পর আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এখনও ওষুধ খাচ্ছি এবং কয়েক দিনের মধ্যেই এই ওষুধের কোর্স শেষ হবে। এখন আমি ভালো আছি। আমার চিকিৎসা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পুরো সময়ে চিকিৎসক এবং হাসপাতালের সমস্ত কর্মীরা যেভাবে পাশে থেকেছেন, তার জন্য আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।”
এই অনুষ্ঠানে সারভাইভাররা একে অপরের সঙ্গে দেখা করার, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার এবং চিকিৎসার পর জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উদযাপন করার সুযোগ পান। ক্যানসারের পর সাহসের সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কঠিন সময়কে জয় করা এবং জীবনের নতুন অধ্যায়কে আপন করে নেওয়ার বার্তা দিয়ে ‘দ্য কারেজ ওয়াক’-এর সমাপ্তি হয়।
