বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা: শারদোৎসবের প্রাক্কালে শহর কলকাতার শিল্পরসিক ও সংগ্রাহকদের জন্য এক মহামূল্যবান উপহার নিয়ে হাজির হলো ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংস্থা ‘আই উইদিন আর্ট’ (Eye Within Art)। ভারতীয় আধুনিক ও সমকালীন চিত্রকলার বিরল ও প্রামাণ্য সৃষ্টির সমাহার নিয়ে সংস্থাটি আয়োজন করেছে তাদের দ্বিতীয় অনলাইন শিল্প নিলাম—‘দ্য অটাম প্যালেট’ (The Autumn Palette)। আন্তর্জাতিক স্তরের ডিজিটাল বিডিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে শহরের কেন্দ্রস্থলে সরাসরি শিল্পকর্ম চাক্ষুষ করার এক বিরল মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই অভিনব প্রদর্শনী ও নিলামের পর্দা উঠল তিলোত্তমায়।
ইএম বাইপাস সংলগ্ন শহরের অন্যতম বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল ‘জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট’-এর ‘স্টুডিও ওয়ান’-এ ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর আয়োজিত হয়েছে এই নিলামের বিশেষ ফিজিক্যাল প্রিভিউ। যেখানে দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সংগ্রাহক ও শিল্পপ্রেমীরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে কালজয়ী শিল্পীদের মূল ক্যানভাসগুলি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিল্প সংগ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে ডিজিটাল নিলামের দর হাঁকার সুযোগ।
কলকাতার শিল্পকলার ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং আধুনিকতার এক মোহময় সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে ‘দ্য অটাম প্যালেট’। ভারতের প্রখ্যাত মাস্টার পেইন্টারদের প্রামাণ্য ও দুর্লভ কাজ নিয়ে আয়োজিত এই নিলাম ঘিরে ইতিমধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগ্রাহক মহলে তৈরি হয়েছে বিপুল উন্মাদনা।
ঐতিহ্যের রজতজয়ন্তী পেরিয়ে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘আই উইদিন আর্ট’

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংস্থাটি ভারতীয় দৃশ্যকলার সংরক্ষণ, প্রসারণ ও বিপণনে দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে চলেছে। ২০২৪ সালে সংস্থাটি গৌরবের সঙ্গে তাদের রজতজয়ন্তী (Silver Jubilee) উদযাপন করে। আজ প্রায় ২৭ বছরের পথচলায় দাঁড়িয়ে তারা কেবল একটি সাধারণ আর্ট গ্যালারি নয়, বরং ভারতীয় শিল্পের প্রামাণ্য দলিলের ডিজিটাল রূপকার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সংস্থার প্রধান প্ল্যাটফর্ম www.indianmasterpainters.com ভারতের প্রাচীনতম শিল্প-বিষয়ক ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলির অন্যতম। ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রাথমিক যুগে যখন শিল্প বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের কথা ভাবাই যেত না, সেই সময় থেকে এই প্ল্যাটফর্মটি দেশীয় মাস্টারদের কাজকে আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরার কাজ শুরু করে।

শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনই নয়, ভারতীয় শিল্প ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম চিত্রশিল্পীদের উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও ‘আই উইদিন আর্ট’ এক অনন্য দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। ভারতের একাধিক আধুনিক চিত্রশিল্পীর প্রাতিষ্ঠানিক ও অফিশিয়াল ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এই সংস্থা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
* আধুনিক ভারতীয় রেখা ও ফর্মের জাদুকর যোগেন চৌধুরী (www.jogenchowdhury.net)
* বিশিষ্ট সমকালীন রূপকার শুভাপ্রসন্ন (www.shuvaprasanna.com)
* কলকাতা পেইন্টার্স দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা বোহেমিয়ান মাস্টার প্রকাশ কর্মকার (www.prokashkarmakar.com)
* গতি ও শক্তির প্রতীক সুনীল দাস (www.sunildas.net)
* নারী অবয়বের রোম্যান্টিক চিত্রকর সুহাস রায় (www.suhasroy.com)
এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মূলধন করেই ‘দ্য অটাম প্যালেট’ শীর্ষক নিলামের আয়োজন করা হয়েছে।
শরতের ক্যানভাসে ভারতীয় মাস্টারের অনন্য সৃষ্টি

‘দ্য অটাম প্যালেট’-এর মূল আকর্ষণ হলো ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার বিভিন্ন ধারার প্রামাণ্য কাজগুলির বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি। বেঙ্গল স্কুল থেকে শুরু করে আধুনিক বিমূর্ততা ও পরাবাস্তববাদের রূপান্তরকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা হয়েছে।
নিলামের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বাংলার কিংবদন্তি শিল্পী গণেশ পাইন-এর একটি নিভৃত ও ভাবগম্ভীর মাস্টারপিস। গণেশ পাইন তাঁর স্বকীয় টেম্পেরা মাধ্যম, আলো-আঁধারির মায়াবী বিন্যাস এবং বিষাদমাখা দার্শনিক রূপকের জন্য বিশ্বখ্যাত। মৃত্যুর রূপক, স্মৃতির চোরাস্রোত এবং ভারতীয় পুরাণের আধুনিক ব্যাখ্যা যেভাবে তাঁর ক্যানভাসে ফুটে ওঠে, তা বিশ্ব চিত্রকলার ইতিহাসে বিরল। নিলামে অন্তর্ভুক্ত তাঁর কাজটি প্রদর্শনী কক্ষে উপস্থিত দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয় তার নিখুঁত রঙের স্তর ও গভীর ভাবাবেগে।
অপরদিকে রয়েছে সুনীল দাস-এর বিখ্যাত অ্যানিমাল স্টাডিজের উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কাজ। ষাট ও সত্তরের দশকে মাদ্রিদের ষাঁড়ের লড়াই দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং পরবর্তীতে কলকাতার প্রেক্ষাপটে সুনীল দাস যে ক্ষিপ্র গতিময় ঘোড়া ও উন্মত্ত ষাঁড়ের স্কেচ ও পেইন্টিং তৈরি করেছিলেন, তা ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে মাইলফলক। নিলামে রাখা তাঁর কাজে ড্রয়িংয়ের বলিষ্ঠ চারকোল ও কালির আঁচড়ে প্রকাশ পেয়েছে আদিম জীবনীশক্তি ও নাটকীয় গতিবেগ।
বেঙ্গল স্কুলের ধ্রুপদী ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে পণ্ডিত ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম-এর ওয়াশ টেকনিকের অসাধারণ কাজ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসুর উত্তরসূরি হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম ভারতীয় অনুচিত্র এবং ঐতিহ্যবাহী জলরঙের ওয়াশ পদ্ধতিকে এক অনন্য কাব্যিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ক্যানভাসে আধ্যাত্মিক স্নিগ্ধতা এবং সূক্ষ্ম রঙের স্তরবিন্যাস শিল্পরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সমকালীন আধুনিকতার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল নাম সঞ্জয় ভট্টাচার্য। তাঁর হাইপার-রিয়্যালিস্টিক (hyper-realist) বা অতিবাস্তবতাবাদী ক্যানভাসে আলোর তীক্ষ্ণ ব্যবহার এবং রহস্যময় স্থাপত্যের আবহ দর্শকদের সম্মোহিত করে। বাস্তব ও পরাবাস্তবের সীমারেখা মুছে দিয়ে তিনি যেভাবে সাধারণ জীবনযাত্রার মাঝে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা তৈরি করেন, তার অনন্য নিদর্শন রয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

ফিজিক্যাল প্রিভিউ ও ডিজিটাল নিলামের মেলবন্ধন: এক নতুন দিগন্ত
কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে শিল্প বিপণন এবং আর্ট অকশনের চরিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বৈশ্বিক নিলাম ঘরগুলি এখন পুরোপুরি অনলাইনমুখী। তবে শিল্পপ্রেমী ও প্রকৃত সংগ্রাহকদের কাছে সরাসরি ক্যানভাসের টেক্সচার, রঙের ঘনত্ব ও ব্রাশের টান প্রত্যক্ষ করার আনন্দ চিরন্তন।
সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ‘আই উইদিন আর্ট’ এক হাইব্রিড মডেল বেছে নিয়েছে। জে ডব্লিউ ম্যারিয়টের সুসজ্জিত স্টুডিও ওয়ানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে মৃদু আলোয় সাজানো মূল চিত্রকর্মগুলি। সেখানে দাঁড়িয়ে সংগ্রাহকরা প্রতিটি কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অবস্থা যাচাই করতে পারছেন।
একই সঙ্গে, লন্ডন, নিউইয়র্ক, সিঙ্গাপুর বা মুম্বইয়ের সংগ্রাহকরা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই নিলামে অংশ নিতে পারেন, তার জন্য সংস্থাটির পোর্টাল www.eyewithinart.com-এ চালু রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল বিডিং ব্যবস্থা। সংগ্রাহকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি শিল্পকর্মের সঙ্গে প্রামাণ্য নথি (Certificate of Authenticity) এবং পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিক বিবরণ (Provenance) নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিজ্ঞ সংগ্রাহকদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের তরুণ শিল্পপ্রেমীদের আর্ট কালেকশনে আগ্রহী করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। ভারতীয় শিল্পের বাজার বর্তমানে এক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সঠিক প্রামাণ্য শিল্পকর্মে বিনিয়োগ কেবল নান্দনিক আনন্দই দেয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তা সুরক্ষিত সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
শিল্প সমালোচক ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
কলকাতার প্রবীণ শিল্প গবেষক ও সংগ্রাহকদের মতে, শারদোৎসবের মুখে এই ধরনের আয়োজন শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক বিশিষ্ট শিল্প বিশেষজ্ঞের কথায়:

“পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের আধুনিকতাবাদী নিরীক্ষা ছিল মূলত মাটি-সংলগ্ন এবং দার্শনিক ভাবনায় সমৃদ্ধ। গণেশ পাইন বা সুনীল দাসের মতো শিল্পীদের কাজের প্রাপ্যতা বাজারে দিন দিন কমছে। এই পরিস্থিতিতে যখন একটি বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম প্রাতিষ্ঠানিক প্রামাণ্যতার সঙ্গে এই পর্যায়ের কাজ নিলামে আনে, তখন তা ভারতীয় শিল্পের ঐতিহাসিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

নিলামে অংশ নিতে এবং দুর্লভ চিত্রকর্মগুলি দেখতে ইতিমধ্যেই শহরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা এবং আর্ট স্কুলের গবেষকেরা ভিড় জমিয়েছেন প্রদর্শনশালায়।
কীভাবে অংশ নেবেন

আন্তর্জাতিক এই নিলামে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক রাখা হয়েছে:
১. বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যে কোনো সংগ্রাহক www.eyewithinart.com ওয়েবসাইটে গিয়ে বিনামূল্যে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন।
২. প্ল্যাটফর্মে লগ-ইন করে প্রতিটি শিল্পকর্মের উচ্চমানের ডিজিটাল ছবি, তার মাপ, ব্যবহৃত মাধ্যম, আনুমানিক দর এবং শিল্পী-পরিচিতি বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।
৩. আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিড করা যাবে।

কলকাতার জে ডব্লিউ ম্যারিয়টে আয়োজিত এই দু’দিনের প্রিভিউ এবং ডিজিটাল অকশন নিঃসন্দেহে তিলোত্তমার শিল্পচর্চায় এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। শিল্পের প্রাচীন আভিজাত্য আর একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ভারতীয় আর্ট মার্কেটকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
