RAJ_0848
Spread the love

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা: শহরের বাতাসে শারদীয়ার আমেজ, কাশের বন আর শিউলি ফুলের গন্ধে মুখরিত চারপাশ। বাংলা যখন মা দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কলকাতার ফ্যাশন ও শিল্প শিক্ষাজগতের অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান ‘এনআইএফ গ্লোবাল সল্টলেক’ (NIF Global Saltlake) আয়োজন করতে চলেছে তাদের বার্ষিক ও বহুল প্রতীক্ষিত উৎসবমুখী ফ্যাশন প্রদর্শনী ‘আগমনী ২০২৬’ (AGOMONI 2026)। আগামী ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে সল্টলেকের সেক্টর-১ অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বর্ণাঢ্য র্যাম্প শো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন শিক্ষার জগতে ‘প্লাটিনাম সেন্টার অফ ইন্ডিয়া’ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছরের মতো এবারও তাদের ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, কারিগরি দক্ষতা এবং আধুনিক চেতনার এক অনন্য ক্যানভাস তুলে ধরছে। পাঁচ ব্যাতিক্রমী থিমভিত্তিক ফ্যাশন সিকোয়েন্স ও শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সমন্বয়ে সাজানো ‘আগমনী ২০২৬’ শুধু একটি সাধারণ ফ্যাশন শো নয়, বরং এটি ঐতিহ্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সামাজিক সচেতনতা ও আধুনিক ফ্যাশন দর্শনের এক অপূর্ব মহোৎসব।

তিন দশকের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের নতুন দিগন্ত

এনআইএফ গ্লোবাল সল্টলেক (সাবেক এনআইআইএফডি) গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ফ্যাশন ও ডিজাইন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং নতুন প্রজন্মের ডিজাইনারদের স্বপ্নের ভিত তৈরি করার এক কারখানা। প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ইন্ডাস্ট্রি-ভিত্তিক বাস্তবমুখী জ্ঞান প্রদান করার পাশাপাশি আজীবন প্লেসমেন্ট সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির পেশাদার সাফল্যের পরিসংখ্যান অত্যন্ত চমকপ্রদ। এখানকার ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের ৯৮ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী দেশের শীর্ষস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলিতে সম্মানজনক পদে কর্মরত। ‘সব্যসাচী ক্যালকাটা’ (Sabyasachi Calcutta), ‘আডিডাস’ (Adidas), ‘জারা’ (Zara), ‘ভেরো মোডা’ (Vero Moda), ‘নাইকি’ (Nike), ‘জ্যাক অ্যান্ড জোন্স’ (Jack & Jones) এবং ‘কেলভিন ক্লেইন’ (Calvin Klein)-এর মতো বিশ্বমানের ব্র্যান্ডে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
শুধু ব্র্যান্ডেই নয়, আন্তর্জাতিক র্যাম্পেও এনআইএফ গ্লোবাল সল্টলেকের শিক্ষার্থীরা বারবার ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন। লন্ডন ফ্যাশন উইক (London Fashion Week), দুবাই ফ্যাশন উইক (Dubai Fashion Week), নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইক (New York Fashion Week) এবং ভারতের অত্যন্ত সম্মানজনক ল্যাকমে ফ্যাশন উইক (Lakme Fashion Week)-এর মতো বিশ্বমঞ্চে তরুণ শিক্ষার্থীদের তৈরি করা পোশাক প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে। ‘আগমনী ২০২৬’ সেই উদীয়মান ডিজাইনারদেরই তৈরি করা সেরা মেধার এক বিশাল প্রদর্শনী যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বজনীন চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

পাঁচ সিকোয়েন্সে নতুন রূপকথা: উৎসবের নতুন ফ্যাশন ধারা

চলতি বছরের ‘আগমনী ২০২৬’ প্রদর্শনীতে মোট ৫টি আলাদা ও স্বতন্ত্র ফ্যাশন সিকোয়েন্স তুলে ধরা হবে। প্রতিটি সিকোয়েন্সের পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ভাবনা, নান্দনিকতা ও গভীর সামাজিক গল্প। তরুণ ডিজাইনাররা চিরাচরিত পোশাকের ভাবধারা ভেঙে কীভাবে নতুন ও আধুনিক ফ্যাশন শৈলী গড়ে তুলেছেন, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

১. আকার (AKAAR): বিমূর্ত লোকশিল্পের নান্দনিক রূপায়ণ

‘আকার’ সিকোয়েন্সটির মূল অনুপ্রেরণা হলো বিমূর্ত লোকশিল্প বা ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট ফোক আর্ট’। জ্যামিতিক নকশা, আঁকাবাঁকা স্বতঃস্ফূর্ত রেখা এবং লোকশিল্পের জৈব রূপকে (organic forms) পোশাকের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • পোশাকের ধরণ: ফিটেড টপ, নিখুঁত কাটের করসেট এবং বাসটিয়ারের সঙ্গে ভলিউমিনাস ফ্লেয়ার প্যান্ট, আধুনিক শারারা এবং ড্রামাটিক ফ্লেয়ার্ড স্কার্ট।
  • রঙের ব্যবহার: মাটির কাছাকাছি উষ্ণ রঙ বা ‘আর্থি প্যালেট’ ব্যবহার করা হয়েছে—যেমন শরতের হেমন্তের রং, মস গ্রিন (শেওলা সবুজ), পিয়ার গ্রাস, কফি ব্রাউন, চকলেট ব্রাউন, বালি ও গমের রং।
  • কারুকার্য: হাত দিয়ে আঁকা ফোক মোটিফ, প্রথাগত কাঁথা সেলাইয়ের কাজ এবং সূক্ষ্ম লেসের সমন্বয়ে লোকশিল্পের ঐতিহ্যকে আধুনিক সিলুয়েটে রূপ দেওয়া হয়েছে।

২. ড্রেপড পাওয়ার (DRAPED POWER): কর্মক্ষেত্রের স্পষ্টতা ও উৎসবের লালিত্য

আধুনিক কর্মজীবী নারীদের রুচিশীলতা এবং শারদীয় উৎসবের আভিজাত্য—এই দুই বিপরীতমুখী ধারণার নিখুঁত ভারসাম্য হলো ‘ড্রেপড পাওয়ার’।
  • পোশাকের ধরণ: সুনির্দিষ্ট কাটের ব্লেজার, ওয়েস্টকোট ও ডিফাইনড ওয়েস্টলাইনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বহমান ও সাবলীল শাড়ির ড্র্যাপারি।
  • রঙের ব্যবহার: গভীর লাল, গাঢ় কালো এবং অক্সিডাইজড গোল্ডের আভা পোশাকে এনে দিয়েছে এক রাজকীয় ও উৎসবমুখর চরিত্র। এটি কর্মক্ষেত্রের পোশাক বা ‘ওয়ার্কওয়্যার’-কে উৎসবের অনবদ্য সাজে রূপান্তর করার এক অসাধারণ প্রয়াস।

৩. অস্তিত্ব (ASTITWA): রূপান্তর ও আত্মোপলব্ধির মানবিক অভিযাত্রা

‘আগমনী ২০২৬’-এর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সামাজিক সচেতনতামূলক সিকোয়েন্স হলো ‘অস্তিত্ব’। একজন রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার) মানুষের সমাজ ও নিজের মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব ভেঙে নিজের প্রকৃত সত্তাকে গ্রহণ করার মানসিক যাত্রাকে ৭টি বিশেষ পোশাকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • সাতটি ধাপ: পরিচয় লুকানোর দিনগুলি থেকে শুরু করে আত্মস্বীকৃতির সাতটি পর্যায়—’ক্লোজেটেড সেলফ’, ‘কলিং সেলফ’, ‘কনফ্লিক্টেড সেলফ’, ‘মিররিং সেলফ’, ‘মেটামরফোসিস’, ‘প্রোটেক্টিভ সেলফ’, ‘হারমোনিয়াস সেলফ’ এবং সবশেষে ‘ট্রু সেলফ’।
  • সিলুয়েটের বিবর্তন: পোশাকের গড়ন প্রথমে ঢিলেঢালা (oversized) ও অস্পষ্ট আকার থেকে ধীরে ধীরে ধারালো, স্থাপত্যবিদ্যাসম্মত (architectural) এবং আত্মবিশ্বাসী আকারে পরিবর্তিত হয়।
  • রঙ ও কাপড়ের ভাষা: গভীর নেভি ব্লু-এর সাথে উজ্জ্বল মাদ্রাজ চেকের বৈপরীত্য আত্মচিন্তা থেকে আত্মপ্রকাশের যাত্রাকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।

৪. নকটার্নাল ড্রিফটার্স (NOCTURNAL DRIFTERS): বিশ্বজনীন সাবকালচারের ঝলক

পাশ্চাত্য ফ্যাশন ভিত্তিক এই কালেকশনটি তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন ধারার যুব-সংস্কৃতি বা সাবকালচারকে কেন্দ্র করে। পাঙ্ক (punk), স্ট্রিট কালচার, রেভ (rave), গ্রাঞ্জ (grunge) এবং অল্টারনেটিভ নান্দনিকতার এক সাহসী মিশেল দেখা যাবে এতে।
  • কাট ও গঠন: বিশালাকার হাতা (oversized sleeves), ড্রামাটিক শোল্ডার, লেয়ার্ড প্যানেল, ভাস্কর্যতুল্য ড্র্যাপারি এবং বিশালাকার ভলিউমের মাধ্যমে দৃশ্যমান গতিময়তা তৈরি করা হয়েছে।
  • ডিজাইন ডিটেইলস: টাই-ডাই, কাপড়ের বৈচিত্র্যময় টেক্সচার এবং খুব সামান্য বা ন্যূনতম এমব্রয়ডারির ব্যবহারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক সমসাময়িক ‘এজি’ (edgy) চরিত্র, যা তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনচেতা মানসিকতাকে তুলে ধরে।

৫. রুহ-ই-পঙ্খ (ROOH-E-PANKH): ভারতীয় ঐতিহ্য ও নারীত্বের সার্বজনীনতা

ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে শিকড় গেড়ে তৈরি এই কালেকশনটি নারীত্বকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের গণ্ডিতে না রেখে, সার্বজনীন মানবিক গুণ হিসেবে তুলে ধরেছে। দয়া, মমতা, সংবেদনশীলতা, কোমলতা এবং সহনশীলতা—যে গুণগুলি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান, তা-ই এর মূল উপজীব্য।
  • পোশাকের বিবরণ: ঐতিহ্যবাহী জমকালো লেহেঙ্গার সাথে স্ট্রাকচার্ড করসেটের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে, যা কোমলতা ও শক্তির মেলবন্ধন ঘটায়।
  • রঙ ও কারুকাজ: শান্তি ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে সাদা রঙের প্রাধান্য রয়েছে। এর পাশাপাশি উজ্জ্বল ‘ছট্টাপাট্টি’ (Chattapatti) প্যাচওয়ার্ক এনে দিয়েছে উৎসবের আমেজ। পোশাকে খোদাই করা ডানামেল পাখির এমব্রয়ডারি স্বাধীনতা, আশা এবং পরিবর্তনের কথা বলে।

সংস্কৃতি ও ফ্যাশনের এক মিলনমেলা

শুধু ফ্যাশন শো-তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না ‘আগমনী ২০২৬’। ফ্যাশন সিকোয়েন্সের পাশাপাশি এনআইএফ গ্লোবাল সল্টলেকের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করবে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৃত্য পরিবেশনা। ফ্যাশনের নান্দনিকতার সঙ্গে বাংলা ও ভারতের নৃত্যালংকার যুক্ত হয়ে উৎসবের আনন্দকে দ্বিগুণ করে তুলবে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের মতে, এই উৎসবের প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কেবল পোশাকের নকশা তৈরিতে দক্ষ করে তোলা নয়, বরং তাদের সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন, সমাজমনস্ক ও আত্মবিশ্বাসী ডিজাইনার হিসেবে গড়ে তোলা, যারা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।
সল্টলেকের ডিডি-৭, সেক্টর-১ (আইএলএস হাসপাতালের পাশে) অবস্থিত এনআইএফ গ্লোবাল সল্টলেক হাউসে এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতিমধ্যেই চরম উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৭ই অক্টোবরের সন্ধ্যায় ফ্যাশনপ্রেমী, ডিজাইনার ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে এক নতুন ফ্যাশন রূপকথার সাক্ষী হতে চলেছে তিলোত্তমা কলকাতা।