বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা:
বাঙালি চিরকালই আবেগের কাঙাল। আর সেই আবেগ যদি মিশে যায় রূপোলি পর্দার কোনো অকালপ্রয়াত নক্ষত্রের শেষ স্মৃতির সাথে, তবে তা এক অন্য মাত্রা পায়। ঠিক তেমনই এক আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকলো কলকাতার এসএসআর গ্লোব সিনেমাস (SSR Globe Cinemas)। গতকাল, ৩রা জুন বিকেল ৪টেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার এক আবহে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল আসন্ন বাংলা চলচ্চিত্র ‘ছবিওয়ালা’-র মিউজিক লঞ্চ অনুষ্ঠান।
পরিচালক বাপ্পা (শুভজ্যোতি) এবং তাঁর গোটা টিম অর্থাৎ ‘দলবল’-এর যৌথ প্রয়াসে তৈরি এই ছবির গান মুক্তির অনুষ্ঠানটি কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল সদ্যপ্রয়াত প্রতিভাবান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এক পরম শ্রদ্ধার্ঘ্য। ছবির পোস্টার জুড়ে থাকা চরিত্রদের আলো-আঁধারির কোলাজ এবং ছবির ট্যাগলাইন ‘A Journey of An Artist’ (এক শিল্পীর জীবন সফর)—শুরুতেই দর্শকদের মনের মণিকোঠায় নাড়া দিয়ে যায়।

ছবির নামকরণ ও পেছনের ট্র্যাজিক প্রেক্ষাপট
বলা বাহুল্য, এই ছবিটির সফর মোটেও সহজ ছিল না। পরিচালক বাপ্পা জানান, ছবিটির প্রাথমিক নাম রাখা হয়েছিল ‘নেগেটিভ’ (Negative)। কিন্তু ছবির শুটিং শেষ হতে না হতেই নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়। ছবির মূল কেন্দ্রীয় চরিত্র, টলিউডের অন্যতম শক্তিশালী ও স্বাধীন চলচ্চিত্রের অকুতোভয় কান্ডারী অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণ ঘটে। এই অকাল প্রয়াণ স্তব্ধ করে দেয় গোটা টলিপাড়াকে।
পরিচালক বাপ্পা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন,
“রাহুল দা শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, আমার মতো নতুন পরিচালকদের জন্য তিনি ছিলেন লাইটহাউস বা পথপ্রদর্শক। আমার প্রথম ছবি ‘শহরের উপকথা’-র সময় যখন ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কোনো গডফাদার ছিল না, তখন রাহুল দা নিজে এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এই ছবিটিকে আমরা কোনো বাণিজ্যিক রূপ দেব না। রাহুল দাকে অমর করে রাখতেই এই ছবির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘ছবিওয়ালা’।”
সবচেয়ে বুক কাঁপানো কাকতালীয় বিষয় হলো, এই ছবির শেষ দৃশ্যে মূল চরিত্রের জলে ডুবে মৃত্যুর একটি দৃশ্য ছিল। বাস্তবেও রাহুলের জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি যেন সেই রূপোলি পর্দার নির্মম বাস্তবকেই প্রতিবিম্বিত করেছে, যা ছবির গোটা টিমকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ছবির গল্প: এক উপেক্ষিত আলোকচিত্রীর লড়াই
‘ছবিওয়ালা’ ছবিটির মূল প্রেক্ষাপট আবর্তিত হয়েছে একজন ফ্রিল্যান্স বা স্বাধীন আলোকচিত্রীকে কেন্দ্র করে। ছবিতে রাহুল অভিনয় করেছেন ‘বিশ্বকর্মা’ নামের এক স্ট্রাগলিং সিনেমাটোগ্রাফার বা ছবিওয়ালার চরিত্রে। বিশ্বকর্মার নান্দনিক বোধ বা ছবির ফ্রেমিং সাধারণ মানুষ বা বাণিজ্যিক দুনিয়া বোঝে না। ফলে চারপাশের সমাজ তাকে একজন ‘ব্যর্থ’ বা ‘খারাপ’ টেকনিশিয়ান হিসেবে দেগে দেয়। সব জায়গা থেকে সে শুধু অবহেলা আর রিজেকশন পায়। একসময় চরম অর্থকষ্টে পড়ে জীবিত মানুষের ছবি তোলার কাজ না পেয়ে, মৃত মানুষের শেষযাত্রার ছবি তোলার কাজও তাকে করতে হয়।
এই কঠিন পরিস্থিতিতেও বিশ্বকর্মার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় তার স্ত্রী ‘মালা’। মালা নিজে একটি সাধারণ ফ্যাক্টরিতে কাজ করে স্বামীর এই পাগলামি এবং শিল্পসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। মালার চরিত্রে অভিনয় করেছেন টলিপাড়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিশালী অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত। এছাড়াও এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে শ্রীলেখা মিত্র, শান্তানু নাথ, রানা বসু ঠাকুর, রিমি দেব, আরাধনা জানা সহ আরও অনেককে। বিশেষ সূত্রে খবর, ছবিতে শ্রীলেখা মিত্রকে একটি বিশেষ ডান্স নম্বর বা আইটেম গানেও পারফর্ম করতে দেখা যাবে।

সুরের মূর্ছনায় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন: গানের দুনিয়ায় নতুন জোয়ার
একটি ছবির প্রাণ হলো তার সঙ্গীত। আর ‘ছবিওয়ালা’-র ক্ষেত্রে সেই সঙ্গীত যেন এক অলৌকিক মাত্রা পেয়েছে। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বর্তমান সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান সুরকার সৌম্য ঋত (Soumyarit)। গতকালের মিউজিক লঞ্চ অনুষ্ঠানে ছবির গানগুলি যখন একে একে শোনানো হচ্ছিল, উপস্থিত দর্শকদের চোখ তখন জলে ভেজা।
ছবির সাউন্ডট্র্যাকে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলা গানের জগতের দিকপাল শিল্পীরা:
-
রূপম ইসলাম: ফসিলস খ্যাত রকস্টার রূপম ইসলামের কণ্ঠে একটি বিশেষ গান রয়েছে, যা সরাসরি অভিনেতা রাহুলের প্রতি ট্রিবিউট বা শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রূপমের চেনা চড়া কিন্তু আবেগঘন কণ্ঠ গানটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
-
সোমলতা আচার্য্য: সোমলতার মিষ্টি অথচ বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠ ছবির আবেগঘন দৃশ্যগুলোকে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।
-
জোজো মুখোপাধ্যায়: জোজোর পাওয়ারপ্যাকড পারফরম্যান্স ছবির আইটেম সং এবং অন্যান্য ড্রামাটিক মুহূর্তে দারুণ গতি এনেছে।
মিউজিক লঞ্চের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুরকার সৌম্য ঋত বলেন, “রাহুল দার জন্য গান বাঁধা সহজ ছিল না। প্রতিটা নোটের পেছনে একটা যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল। রূপম দা, সোমলতা বা জোজোদি—কেউই এটিকে শুধু কাজ হিসেবে নেননি, প্রত্যেকে নিজেদের মনের সবটুকু আবেগ ঢেলে গেয়েছেন।”

বিনোদন জগতে এক অনন্য নজির: সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদর্শিত হবে ‘ছবিওয়ালা’
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে সিনেমা তৈরি হয়, সেখানে ‘ছবিওয়ালা’-র প্রযোজক সংস্থা (A4J Films ও Matchstickx Motion Pictures) এবং পরিচালক বাপ্পা এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ছবি থেকে তারা একটি টাকাও লাভ বা প্রফিট করতে চান না।
প্রযোজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিনেমাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (Free of Cost) সাধারণ দর্শকদের দেখানো হবে। এটিই হবে অভিনেতা রাহুলের প্রতি দর্শকদের এবং চলচ্চিত্র পরিবারের শেষ বিদায় ও সম্মান জ্ঞাপন। বর্তমানে ছবির টিম পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সিনেমা হলের মালিক ও পরিবেশকদের (Distributors) কাছে আবেদন জানাচ্ছেন, যেন তারা মানবিকতার খাতিরে এবং এই মহান শিল্পীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে সপ্তাহে অন্তত কিছু শো বিনামূল্যে দেখানোর ব্যবস্থা করে দেন।
ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। থিয়েটার ও হল মালিকদের একাংশ ইতিমধ্যেই এই মহৎ উদ্যোগে সামিল হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

চাঁদের হাট এসএসআর গ্লোব সিনেমা্সে
গতকালের অনুষ্ঠানটি ছিল কার্যত টলিপাড়ার এক চাঁদের হাট। ছবির পরিচালক বাপ্পা ও তাঁর ‘দলবল’ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দেবলীনা দত্ত, রানা বসু ঠাকুর সহ ছবির অন্যান্য কলাকুশলীরা। রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হচ্ছিল। মঞ্চের এক কোণায় রাখা ছিল প্রয়াত অভিনেতার একটি প্রতিকৃতি, যেখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়।
অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, “ফ্রেমে যখনই রাহুলকে দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল এই তো ও পাশ থেকে ডেকে উঠবে। ‘ছবিওয়ালা’ শুধু একটা সিনেমা নয়, এটা আমাদের বুকের ভেতর জমে থাকা একটা পাথর। আশা করি দর্শকরা ফ্রিতে টিকিট কেটে হলেও সিনেমা হলে আসবেন এবং রাহুলের এই শেষ কাজটিকে সার্থক করবেন।”

ছবির মূল কলাকুশলী ও এক নজরে তথ্য (Credits Table)
সংবাদপত্রের পাঠকদের সুবিধার্থে ছবির মূল বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
| বিবরণ | তথ্য |
| ছবির নাম | ছবিওয়ালা (Chobiwala) – পূর্বনাম ‘নেগেটিভ’ |
| পরিচালনা | বাপ্পা ও দলবল (Subhrajyoti & Team) |
| প্রযোজনা সংস্থা | A4J Films এবং Matchstickx Motion Pictures |
| প্রধান কাস্ট | রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবলীনা দত্ত, শ্রীলেখা মিত্র, শান্তানু নাথ, রানা বসু ঠাকুর, রিমি দেব, আরাধনা জানা |
| সঙ্গীত পরিচালক | সৌম্য ঋত (Soumyarit) |
| কণ্ঠশিল্পী | রূপম ইসলাম, সোমলতা আচার্য্য, জোজো মুখোপাধ্যায় |
| ডিজিটাল ও সিনেমা পার্টনার | SSR Cinemas Pvt. Ltd. / Just Lateral Think Ink |
| মুক্তির ধরণ | সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যহীন এবং সাধারণের জন্য বিনামূল্যে |
প্রতিবেদকের শেষ কথা: শিল্পীর মৃত্যু নেই
‘ছবিওয়ালা’ ছবির পোস্টারে লেখা আছে—‘A Journey of An Artist’। সত্যি তো, শিল্পীর শরীরী মৃত্যু হলেও তার সৃষ্টি থেকে যায় অনন্তকাল। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে হয়তো নেই, কিন্তু পরিচালক বাপ্পা এবং তাঁর টিমের এই সৎ ও নিঃস্বার্থ প্রয়াস প্রমাণ করে দিল যে টলিপাড়ায় এখনও প্রকৃত শিল্পের কদর ফুরিয়ে যায়নি।
এসএসআর গ্লোব সিনেমাসের হল থেকে যখন দর্শকরা বের হচ্ছিলেন, তখন সবার মুখে একটাই গুঞ্জন—কবে প্রেক্ষাগৃহে আসবে এই ‘ছবিওয়ালা’? সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে যখন রূপোলি পর্দায় বিশ্বকর্মা রূপী রাহুল আবার ক্যামেরা হাতে ভেসে উঠবেন, তখন হয়তো করতালির চেয়ে দর্শকদের চোখের জলই হবে সেই মহান শিল্পীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
বাঙালি দর্শক হিসেবে এই ঐতিহাসিক এবং আবেগের ছবির সাক্ষী থাকা আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য। আসুন, আমরাও সামিল হই এক অসামান্য শিল্পীর শেষ যাত্রার এই জয়গানে।



