নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পবিত্র এক উৎসব। লক্ষ্মী মানেই সমৃদ্ধি, লক্ষ্মী মানেই আলোকবর্তিকা। ধনধান্য ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরাধনার এই পুণ্যলগ্নে নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে এক অনন্য সামাজিক উদ্যোগের সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা। কলকাতার প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিটের অ্যালেন পার্কে আয়োজিত হলো এক বর্ণাঢ্য ল্যাপটপ বিতরণ কর্মসূচি (“Laptop Distribution Ceremony”)। ‘কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘ’ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও আন্তর্জাতিক যৌথ সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান অয়েল পেট্রোনাস’ (IndianOil Petronas)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সমাজের পিছিয়ে পড়া অথচ কৃতি ও মেধাবী ছাত্রীদের হাতে আধুনিক ল্যাপটপ তুলে দেওয়া হয়।উৎসবের মরশুমে দেবীর প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার এই উপহার পেয়ে উচ্ছ্বসিত উপস্থিত ছাত্রীরা। উদ্যোক্তাদের বার্তা— বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষার আলো এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধনই পারে দেশের মেয়েদের প্রকৃত অর্থে স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে।

উৎসব ও সমাজকল্যাণের মেলবন্ধন
আজ ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ অ্যালেন পার্কে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। প্রদীপ প্রজ্বলন এবং মা লক্ষ্মীর বন্দনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ ঘটে। সভামঞ্চটি সাজানো হয়েছিল সনাতনী ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে। দেবীর প্রতিমার পাশাপাশি মঞ্চের কেন্দ্রীয় প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদ্যার প্রতীক হিসেবে ল্যাপটপ ও গ্রন্থ।

অনুষ্ঠানের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছিল— “Empowering brilliant girls. Enabling brighter futures” অর্থাৎ “মেধাবী কন্যাদের ক্ষমতায়ন, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের উন্মোচন”। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহায়তা করাই হলো সনাতন চেতনার মূল উদ্দেশ্য। আর সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আজকের এই মহতী আয়োজন।

মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্ট নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তাবৃন্দ
অনুষ্ঠানে কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘের শীর্ষ আধিকারিক ও বিশিষ্ট সমাজসেবীরা উপস্থিত ছিলেন। সংস্থার সভাপতি শঙ্কু দেব পণ্ডা, সাধারণ সম্পাদক নবীন মিশ্র এবং সহ-সভাপতি ভোলা প্রসাদ সোনকর মঞ্চে উপস্থিত থেকে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন ও ছাত্রীদের উৎসাহ দেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সঙ্ঘের সমাজসেবা সম্পাদক রবি কেসওয়ানি, কোষাধ্যক্ষ পিন্টু দাস এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা অনুশকা চক্রবর্তী।
ইন্ডিয়ান অয়েল পেট্রোনাস সংস্থার প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে “ফুয়েলিং ব্রাইটার টুমরোজ” (Fuelling Brighter Tomorrows) দর্শনের আওতায় এই কর্মসূচি রূপায়িত হয়।
কেন এই উদ্যোগ: ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণ
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। উচ্চশিক্ষা, বৃত্তিমূলক পাঠ্যক্রম, কোডিং, কিংবা সরকারি-বেসরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি— সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট ও ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু অনেক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রীদের কাছে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আধুনিক প্রযুক্তি ডিভাইস কেনা সম্ভব হয় না।

এই প্রসঙ্গে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আজকের এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
* ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা (Education for a Stronger Tomorrow): প্রযুক্তিগত সুবিধার মাধ্যমে ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ পড়াশোনাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা।
* মেধাবী ছাত্রীদের সহায়তা (Support for Meritorious Girls): অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা যেন কোনো প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
* ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণ (Bridging the Digital Divide): শহুরে কিংবা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানদের ডিজিটাল প্রযুক্তির সমান সুযোগ দেওয়া।
* উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ (Building Brighter Futures): স্বাবলম্বী হয়ে মেয়েরা যাতে দেশ ও সমাজের কর্ণধার হতে পারে, সেই আত্মবিশ্বাস জোগানো।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘের সভাপতি শঙ্কু দেব পণ্ডা বলেন, “মা লক্ষ্মী কেবল সম্পদের দেবী নন, তিনি শ্রী ও প্রজ্ঞারও প্রতীক। সনাতন ধর্মে নারীকে শক্তির রূপ ও জ্ঞানের আধার হিসেবে দেখা হয়েছে। আজ আমাদের ঘরের মেয়েরা পড়াশোনায় অসামান্য মেধার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই শুধু একটি ডিভাইসের অভাবে তারা বিশ্বমানের পড়াশোনা বা অনলাইন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। আজকের এই ল্যাপটপ কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি তাদের স্বপ্নের ডানা মেলার একটি মাধ্যম। ইন্ডিয়ান অয়েল পেট্রোনাস যেভাবে আমাদের সাথে এই উদ্যোগে হাত মিলিয়েছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক নবীন মিশ্র জানান, “আমরা বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছাত্রীদের চিহ্নিত করেছি। আমাদের বিশ্বাস, এই ছাত্রীরা আগামী দিনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজের নেতৃত্ব দেবে। ‘অহং সনাতনী অস্মি’ মন্ত্রের গভীর অর্থ হলো মানবসেবা এবং সমাজের উন্নতিতে নিজেকে উৎসর্গ করা।”
সহ-সভাপতি ভোলা প্রসাদ সোনকর ও সমাজসেবা সম্পাদক রবি কেসওয়ানি বলেন, সঙ্ঘের সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্য, রক্তদান ও শিক্ষার পাশাপাশি যুবসমাজের হাতে কর্মসংস্থানের হাতিয়ার তুলে দিতে এই ধরনের ডিজিটাল সহায়তা আরও বৃদ্ধি করা হবে।

আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় ভাসল ছাত্রীরা
ল্যাপটপ হাতে পাওয়ার পর ছাত্রীদের চোখেমুখে ছিল আনন্দের ছাপ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি ও স্নাতক স্তরের একাধিক ছাত্রী তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।
এক ছাত্রী বলেন, “অনলাইন ক্লাস, বিভিন্ন নোট সংগ্রহ এবং পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করার জন্য সাইবার ক্যাফেতে যেতে হতো অথবা বাবার ফোনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন নিজের একটা ল্যাপটপ থাকায় পড়াশোনা অনেক সহজ হবে। লক্ষ্মীপুজোর দিনে এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না।”
অভিভাবকরাও উদ্যোক্তাদের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, পুজোর দিন এমন উপহার তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনায় নতুন প্রেরণা জোগাবে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সমাপ্তি
ল্যাপটপ বিতরণের পাশাপাশি এদিনের অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যার দায়িত্বে ছিলেন সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা অনুশকা চক্রবর্তী। সমবেত কণ্ঠে বন্দনাগীতি এবং উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটে। সমগ্র অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মিষ্টিমুখ করানো হয়।
পার্ক স্ট্রিটের অ্যালেন পার্কের এই অনন্য উদ্যোগ শহর কলকাতার সামাজিক দায়বদ্ধতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। উৎসবের প্রকৃত আনন্দ যে অপরের মুখে হাসি ফোটানো এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত— কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘ ও ইন্ডিয়ান অয়েল পেট্রোনাসের এই যৌথ পদক্ষেপ যেন সেই বার্তাই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিল।
